বুধবার, ১৪ এপ্রিল ২০২১, ০৪:০৯ পূর্বাহ্ন
Title :
ড্রীমল্যান্ড ঢাকা রিসোর্ট এন্ড রেস্টুরেন্ট এর পথচলা শুরু। রাণীনগরে ১৩ মামলার আসামীসহ দুইজন গ্রেফতার সফল যারা কেমন তারা আনিসুর রহমান নিলয় (Founder of Niloy it Institute) মিরপুর প্রেসক্লাবে ২৫ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা একজন বর্ষীয়ান ও সফল রাজনীতিবিদের সংক্ষিপ্ত জীবনী Rabindra Cancer Center & Research Institute to be built in house of Tagore patisar রবিতীর্থ পতিসরে “রবীন্দ্র ক্যান্সার সেন্টার এন্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট স্থাপনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত বাগমারায় ইউপি নির্বাচন ঘিরে আ’লীগের দলীয় ফরম বিতরণের উদ্বোধন করলেন এমপি এনামুল হক অসহায় পথশিশুদের মাঝে ছাত্রলীগ নেত্রীর খাবার বিতরণ অসহায় পথশিশুদের মাঝে ছাত্রলীগ নেত্রীর খাবার বিতরণ




রবীন্দ্রনাথের সমাজ ভাবনা পরিপ্রেক্ষিত পতিসর

Reporter Name
  • Update Time : বৃহস্পতিবার, ৯ মে, ২০১৯
  • ৩৫৯ Time View

এম. মতিউর রহমান মামুন: বাংলাদেশ রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি বিজড়িত পতিসর-শিলাইদহ-শাহজাদপুর এই তিনটি স্থানের মধ্যে পতিসর ছিলো কবির নিজস্ব। অথচ পতিসরই আছে উপেক্ষিত। ইতিমধ্যেই মহামান্য রাষ্ট্রাপতি আলহাজ্ব এড. আব্দুল হামিদ রবিতীর্থ পতিসর ঘুরে গেছেন। তাঁর আগমনে অঞ্চলের গণমানুষ.রবীন্দ্র গবেষক, সংস্কৃতিমনা মানুষের নতুন করে স্বপ্ন দেখেছেন হয়তো এবার তাদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ হতে পারে।
তাদের চাওয়া পতিসরে পূর্ণাঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, কবি প্রতিষ্ঠিত ‘ কালীগ্রাম রথীন্দ্রনাথ ইনস্টিটিউশন জাতীয় করণ, পতিসরে অবস্থিত মিউজিয়াম পূর্ণাঙ্গ করণ সহ আরও কিছু।

১৮৯১ সালের ১৩ই জানুয়ারী কবিগুরু পতিসরে পা রেখেই শিক্ষা বঞ্চিত, হতদরিদ্র মানুষের কথা ভেবে তাদের শিক্ষিত করার লক্ষে ১৯০৫ সালে এম. ই স্কুল স্থাপন করে এই অঞ্চলের শিক্ষা বিস্তারের কাজ শুরু করেছিলেন। মাটির দেয়ালের টিন টালির ছাউনিতে স্কুলটির যাত্রা। ‘শুধু বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে, উপদেশ দিয়ে রবীন্দ্রনাথ ক্ষান্ত হননি বরং শিলাইদহ ও কালীগ্রামে হাতে কলমে এই কাজে প্রবৃত্ত হয়েছিলেন’ (রবি জীবনী প্রশান্ত কুমার পাল পৃষ্ঠা ৩১২)। সে সময়ে ভারতে স্কুল কলেজের সংখ্যা হাতেগোনা। গ্রামঞ্চলের মানুষের শিক্ষার কথা ভাবাই হয়নি। রবীন্দ্রনাথ ভেবেছিলেন গ্রামীণ জীবন ও জনপদের কথা, পিছিয়ে পড়া গ্রামের মানুষকে শিক্ষিত করতে রবীন্দ্রনাথ বিদ্যালয় স্থাপনের পাশাপাশি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কিছু বই পত্র এনে শ্যালক নগেন্দ্রনাথের নামে একটি গ্রন্থাগার করেছিলেন পতিসরে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গ্রামঅঞ্চলের মানুষ কে যে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত স্বপ্ন দেখেছিলেন তা ব্যাস্তবে পরিনত হ’ল স্বাধীনতার ৪৬ বছর পর শাহাজাদপুরে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় আনুষ্ঠানিক উদ্বধোনের মধ্যে দিয়ে। খবরটা আমাদের জন্য আনন্দের এবং গর্বের। অপর দিকে কিছুটা হতাশা দেখা দিয়েছে কবির নিজেস্ব জমিদারি পতিসরে আনুষ্ঠানিক কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ঘোষণা হয়নি বলে। সংস্কৃতিবান মানুষের অনেক দিনের দাবি ছিল বিশ্বকবির নিজস্ব জমিদারি কালীগ্রাম পরগনার পতিসরে রবীন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার জন্য এবং এ বিষয়ে তাদের যথেষ্ট যুক্তি আছে। “শিলাইদহ-শাহাজাদপুর-পতিসর-পূর্ব বঙ্গের এই তিন এলাকার জমিদারি কর্মসুত্রে রবীন্দ্রনাথের যাতায়াত ও অবস্থানের কথা আমাদের জানা আছে কিন্তু জানা হয়নি কবির কর্মভূমি কি ভাবে তাঁর মানুষ ভূমির গড়নের সঙ্গে জরিয়ে পড়ল। রবীন্দ্রনাথের পরিব্যাপ্ত শিল্প মানস ও জীবন বেদ বুঝবার জন্য তাঁর পতিসরকে গভির অনুধ্যান দরকার। এক্ষেত্রে শিলাইদহ সাজাদপুরের উপর গবেষক, বিশ্লেষক,রবীন্দ্র গবেষকদের গভির দৃষ্টিপাত ঘটলে ও পতিসর ছিল বরাবরই উপেক্ষিত” (রবিতীর্থ পতিসর আহমদ রফিক)। অথচ এই পতিসরই রবীন্দ্রনাথের পল্লীচিন্তা, শিক্ষা ভাবনা ও স্বদেশ ভাবনার আশ্চর্য সংহতি অর্জন করেছিল। দেশর সত্যিকারের রুপ পতিসরে এস খুঁজে পেয়েছিলেন । প্রকৃত পক্ষে পতিসরে ঘটেছিল কবিসত্তা ও কর্মিসত্তার এক ভিন্নতর উদ্ভাসন।

১৮৯১ সালের ১৩ জানুয়ারী নিজ জমিদারি পতিসরে এসে কবি চারিদিকে ঘুরে ফিড়ে বেড়িয়েছেন, যেমন নাগর নদীতে ভেসে তেমনি নাগর নদীর পাড়ে, মাঠে এবং আসে পাশে হেটে। সে দেখার অভিজ্ঞতা নিঃশব্দে প্রভাব ফেলেছে কবির অন্তরে। তাই তাঁকে বলতে শুনি ‘তোমরা যে পার যেখানে পার এক-একটি গ্রামের ভার গ্রহণ করিয়া সেখানে গিয়া আশ্রয় লও। গ্রাম গুলিকে ব্যবস্থাবদ্ধ করো। শিক্ষা দাও, কৃষি শিল্প ও গ্রামের ব্যবহার-সামগ্রী সম্বন্ধে নতুন চেষ্টা প্রবর্তিত করো’ (রবীন্দ্ররচনাবলী ১০ম খন্ড পৃঃ ৫২০-২১)। এ প্রভাব তার মানবিক চেতনাকে উদ্দীপ্ত করেই সম্ভবত তাকে সাধারণ মানুষের, দুস্থ গ্রাম্য চাষির জটিল সমস্যা জীবনের গভিরে নিয়ে গেছে স্বাভাবিকতায়।
এমনি এক আত্মিক সম্পর্কের মধ্যে দিয়ে রবীন্দ্রনাথ চরম সত্য উপলব্ধি করে বুঝতে পারেন এই এলাকার প্রজা চাষীদের দুঃখ দুর্দশার প্রধান কারণ অশিক্ষা। অন্য দিকে নিজ জমিদারি কালীগ্রামের সহজ সরল অল্প আয়ের সল্প শিক্ষিত মানুষ গুলোর প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা অনুভবের মধ্যে দিয়ে কবি লিখেছেন ‘কোথায় প্যারিসের আর্টিস্ট-সম্প্রদায়ের উদ্দাম উন্মত্ততা আর কোথায় আমার কালীগ্রামের সরল চাষী প্রজাদের দুঃখ দৈন্য-নিবেদন!…এদের অকৃতিম ভালোবাসা এবং এদের অসহ্য কষ্ট দেখলে আমার চোখে জ্বল আসে।…বাস্তবিক এরা যেন আমার একটি দেশ জোরা বৃহৎ পরিবারের লোক”। (ছিন্নপত্রাবলি ১১১সংখ্যক চিঠি) সেই উপলব্ধি থেকে প্রায় ২০০টি গ্রামে অবৈতনিক পাঠশালা এবং ৩টি উচ্চ বিদ্যালয় স্থাপনের মধ্যে দিয়ে রবীন্দ্রনাথ এই অঞ্চলের শিক্ষার ব্যবস্থার গোড়াপত্তন করেন।

পাশাপাশি স্বাস্থ সেবা, আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা, কৃষি সমবায় ব্যাংক (১৯০৫) স্থাপন অর্থাৎ সমাজ সংস্কারণ। আজ থেকে শত বছর পূর্বে পল্লীগঠণ, গ্রামোন্নয়ন ও ক্ষুদ্র ঋণ দান কর্মসুচির গোড়াপত্তন করেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কাজটা শুরু করেছিলেন নিভৃত পল্লী পতিসরে। ১৯০৫ সালে কৃষি সমবায় ব্যাংক স্থাপন করে গরীব চাষিদের সহত শর্তে ঋণ প্রদান করে কৃষি বিপ্লব ঘটিয়ে দাসত্ব গোলামির জীঞ্জির থেকে কৃষককে মুক্ত করার যে প্রয়াস পেয়েছিলেন তাতো তৎকালীন ভারতের বিরল ঘটনাই বলা যায়। ‘১৯০৫ সালে পতিসরে কৃষি ব্যাংক স্থাপন করার পর কৃষকদের মধ্যে ব্যাংক এতোই জনপ্রিয় হয়ে উঠে যে, তাঁদের ঋণের চাহিদা মিটানো স্বল্প শক্তির এ ব্যাংকের পক্ষে সম্ভব ছিলনা। অবশ্য সমস্যার কিছুটা সমাধান হয় নোবেল পুরস্কারের টাকা ১৯১৪ সালের প্রথম দিকে কৃষি ব্যাংকে জমা হওয়ার পর’। (রবীন্দ্র জীবনী প্রশান্ত কুমার পাল ২য় পৃ. ৪৬২)। আধুনিক চাষবাদ, আধুনিক যন্ত্রপাতি ক্রয়, খামার ব্যবস্থাপনা, হস্ত ও কুঠির শিল্প, তাঁত শিল্প, রেশম শিল্পের বিকাশ ঘটানো, ও দারিদ্র বিমোচনের জন্য যে ঋণ কর্মসূচি বলা যেতে পারে রবীন্দ্রনাথের কালীগ্রামের গ্রামোউন্নয়ণ ও মহাজনকে এলাকা ছাড়ানো। তাই ঘটেছিল মহাজনরা এলাকা ছাড়লো কৃষক ও কৃষির উন্নতি হল। আর কৃষিতে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার, ব্যাংকে মূলধোন বৃদ্ধি এ সব কর্মকান্ড ছিল রবীন্দ্রনাথের স্বদেশী সমাজ ভাবনার পূর্বাপর লক্ষ্য। তিনি পুত্র ও জামাতাকে কৃষিতে উচ্চ শিক্ষার জন্য বিদেশে পাঠিয়ে চিঠিতে লিখেছেন ‘তোমরা দুর্ভিক্ষপীড়িত প্রজার অন্ন গ্রাসের অংশ নিয়ে বিদেশে কৃষি শিখতে গেছ ফিরে এসে এই হতভাগ্যদের অন্নগ্রাস কিছু পরিমানে ও যদি বাড়িয়ে দিতে পার তাহলে মনে শান্তনা পাব। মনে রেখো জমিদারের টাকা চাষির টাকা এবং এই চাষিরাই তোমাদেও শিক্ষার ব্যায়ভার নিজেরা আধপেটা খেয়ে এবং না খেয়ে বহন করছে। এদের ঋণ সম্পর্ণ শোধ করবার দায় তোমাদের উপর রইল। নিজেদের সংসারিক উন্নতির চেয়ে ও এইটেই তোমাদের প্রথম কর্তব্য হবে’। (চিঠি পত্র ১৯ পৃ. ১১১) কালীগ্রামের এসব কর্মযজ্ঞ রবীন্দ্রনাথ সম্পন্ন সফল হয়েছিলেন তা কবি পুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আলোচনা থেকে অনুমান করা যায় “সেবার পতিসরে পৌঁছে গ্রাম বাসীদের অবস্থার অন্নতি দেখে মনপুলকিত হয়ে উঠলো। পতিসরের হাইস্কুলে ছাত্র আর ধরছেনা। দেখলুম-নৌকার পর নৌকা নাবিয়ে দিয়ে যাচ্ছে ছেলের দল স্কুলের ঘাটে। এমনকি, আট দশ মাইল দুরের গ্রাম খেকে ও ছাত্র আসছে। পড়াশুনার ব্যবস্থা প্রথম শ্রেনীর কোন ইস্কুলের চেয়ে নিকৃষ্ট নয়। পাঠশালা, মাইনর স্কুল সর্বত্র ছড়িয়ে গেছে। হাসপাতাল ও ডিসস্প্রেনছাড়ির কাজ ভালো চলছে। যেসব জোলা আগে এক সময গামছা বুনত তাঁরা এখন ধুতি, শাড়ী, বিছানার চাদর বুনতে পারছে। কুমোড়দের ও কাজের উন্নতি হয়েছে গ্রাম বাসির আর্থিক দুরবস্থা আর নেই। শুধু চাষীরা অণুযোগ জানালো তাদেরকে চাষের জন্য আরও ট্রাক্টর এনে দেওয়ার জন্য” (পিতৃস্মৃতি রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর)। রবীন্দ্রনাথ পতিসরের বাস্তব অবস্থা থেকেই অনুমান করেছিলেন শিক্ষা ব্যাতিত বিত্ত রক্ষা সম্ভব নয় তাই তিনি শিক্ষা বঞ্চিত অসহায় সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার ফিরিয়ে দিতে, অর্থ বিত্তে স্বাবলম্বি করতে, তার নিজেস্ব জমিদারি পতিসরে কাজ শুরু করেছিলেন। মোট কথা তাঁর সাহিত্য সৃষ্টি যেখানে গ্রামের ধুলো কাদা মাটির স্পর্শ নিয়ে খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের প্রতি মমর্তবোধ ভালোবাসা দেশপ্রেম প্রতিফলিত হয়েছে, যে মাটির মাঝে মায়ের অস্তিত্ব কল্পনা করে শ্রদ্ধায় মাথা নূয়ে স্বর্গকে কল্পনা করেছেন, সেখানে পতিসরের দানই প্রধান। আর সৃষ্টি কর্মের প্রসঙ্গ বাদ দিলে পতিসরের গুরুত্ব আরো বেড়ে যায় এ জন্য যে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য সাধনার বাইরে পল্লী পূর্ণগঠণ কর্মকান্ডের যা কিছু সাফল্য তা এই পতিসরে।

লেখক: রবীন্দ্রস্মৃতি সংগ্রাহক




More News Of This Category
© All rights reserved © 2020 Atozithost
Design & Developed by: ATOZ IT HOST
Tuhin