রবিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২১, ০২:৫৭ পূর্বাহ্ন
Title :
গুলশান ওয়েলফেয়ার ক্লাবের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ ভোটে সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন মানবিক বন্ধু দিপু রাণীনগরে ইয়াবাসহ মাদক ব্যবসায়ী আটক কবিতা: অভিযোগ বাগমারা ১৩ নং গোয়ালকান্দী ইউপি ৩ নং ওয়ার্ডে ছাত্রলীগের ৭৩ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিন রাণীনগরে শীতার্তদের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ রাণীনগরে ছাত্রলীগের ৭৩ তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উদযাপন রাণীনগরের মেঘনা অধ্যয় কেন্দ্রের শিক্ষার্থীদের মাঝে বই ও স্বাস্থ্য উপকরণ বিতরণ তরুন যুব সংঘ এর পূর্নাঙ্গ কমিটি গঠিত। সভাপতি- তৌহিদ সানি, সাধারন সম্পাদক – আকিব বাগমারা তাহেরপুরে ট্রাক চাপায় নিহত এক আহত এক নন্দীগ্রামে পুত্রবধু ধর্ষণ মামলায় শশুর গ্রেপ্তার




রবীন্দ্র মানসসরোবরে বিশ্বায়ন

Reporter Name
  • Update Time : রবিবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০১৯
  • ৭ Time View

রবীন্দ্রনাথ বিশ্বনন্দিত হওয়ার অন্তরালে যে বিষয়গুলো কাজ করেছে তার প্রধান দিকটা ছিল তাঁর অসাম্প্রদায়িকতা। কোন ধর্ম-বর্ণ, জাতি-ভেদ, লোভ- লালসা রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য সাধনার পথকে রুদ্ধ করতে পারেনি। একদা কবিগুরু তার ধর্ম বিশ্বাস সর্ম্পকে আলোচনা করতে গিয়ে লিখলেন “সকল মানুষেরই ‘আমার ধর্ম ’ বলে একটা বিশেষ জিনিষ আছে। কিন্তু সেইটিকে সে স্পষ্ট করে জানেনা। সে জানে আমি মুসলমান, আমি খৃষ্টান, আমি বৈষ্ণব, আমি শান্ত ইত্যাদি। কিন্তু নিজেকে যে ধর্মাবলম্বী বলে জন্মকাল থেকে মৃত্যুকাল পর্যন্ত নিশ্চিত আছে সে হয়ত সত্য তা নয়।

নাম গ্রহণেই এমন একটা আড়াল তৈরী করে দেয়া যাতে নিজের ভিতরকার ধর্মটা তার নিজের চোখেও পড়েনা”(আত্মপরিচয়)। যদি প্রশ্ন আসে কোন ধর্মটি তাঁর ‘যে ধর্ম মনের ভিতরে গোপন থেকে যুগে যুগে তাকে সৃষ্টি করে তুলেছে’ (আত্মপরিচয়)। কবি এ বিষয়ে আরো বলেছেন, আমার ধর্ম কী, তা সে আজও আমি সম্পূর্ণ এবং সুস্পষ্ট করে জানি, এমন কথা আমি বলতে পারিনে অনুশাসন আকারে তত্ব আকারে কোন পুঁথিতে লেখা ধর্ম সে তা নয় (রবীন্দ্রনাথের ধর্ম মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী)। আসলে কবি কোন ধর্ম ও সাম্প্রদায়িকতায় বিশ্বাসী ছিলেন না তা কবি জসীম উদ্দিনের আলোচনা থেকে একটু অনুমান করা যায়।“ আমি তখন এম এ পড়তে কলিকাতা এম,সি,এ হোস্টেলে ছিলাম। সেই সময়ে আমি প্রায়ই কবির সঙ্গে দেখা করতে যেতাম; আমাকে দেখলেই কবি সাম্প্রদায়িক ব্যাপার নিয়ে আলোচনা করতেন। তিনি বলতেন “কেন যে মানুষ একের অপরাধের জন্য অপরকে মারে! ও দেশের মুসলমানেরা হিন্দুদের মারল, তাই এ দেশের হিন্দুরা মুসলমানদের মেরে তার প্রতিবাদ করবে, এই বর্বর মনোবৃত্তির হাত থেকে দেশ কিভাবে উদ্ধার পাবে বলতে পার? দেখ, কি সামান্য ব্যাপার নিয়ে কলহ হয়। গরু কোরবানী নিয়ে মসজিদের সামনে বাজনা নিয়ে।

একটা পশুকে রক্ষা করতে কত মানুষকে মানুষ হত্যা করছে”(রবীন্দ্রস্মৃতি জসীম উদ্দিন)। সাম্প্রদায়িক সমস্যা নিয়ে আরও বলতেন, “দেশলাইয়ের কাঠি জ্বালিয়ে দিলেই যে ঘরে আগুন লাগে তার কারণ সেই ঘরের মধ্যে বহুকাল আগুন সঞ্চিত ছিল। যারা বলতে চান আমরা সবাই মিলমিশ হয়ে ছিলুম ভালো, ইংরেজ এসেই আমাদের মধ্যে আগুন ধরিয়ে দিল, তাঁরা সমস্যাটিকে এড়িয়ে যেতে চান” (রবীন্দ্রস্মৃতি জসীম উদ্দিন)। কবির মনে একদেশদর্শী হিন্দুত্বের স্থান ছিলনা। মুসলমানদের মধ্যে যাঁরা স্বাধীন মতবাদ নিয়ে, ধর্ম ও সমাজ ব্যবস্থার সমালোচনা করতেন তাদের প্রতি কবির মনে প্রগাঢ় অনুরাগ ছিল। সমাজ ও সম্প্রদায়ের গন্ডি পেরিয়ে কবি সেখানেই যেতে চান যার প্রতিষ্ঠাভূমি হচ্ছে শুধু উদার মনুষ্যত্ব। ঠিক যেন গোরা উপন্যাসের নায়ক গোরার মতো। গোরা প্রথমে ছিল নিষ্ঠাবান হিন্দু, হিন্দুত্বের অলি গলিতে এমন কোন আচার, এমন কোন বিশ্বাস ছিলনা, যা অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে গোরা প্রতিপালন না করত। একদিন সে জানতে পারল, সে হিন্দু সন্তানতো নয়ই, বরং ভারতবর্ষীয়ও নয়। তখন যেন এক মূহুর্র্তেই তাঁর চোখের সামনে থেকে সমস্ত ধর্মীয় ভেদ ও সংকীর্ণতার আবরণ খসে পড়ল। তখন তাকে বলতে শুনি, ‘আমি হিন্দু নই। আজ আমি মুক্ত পরেশ বাবু। আমি যে পতিত হব, ব্রত হব, সে ভয় আর আমার নেই, আমাকে আর পদে পদে মাটির দিকে চেয়ে শুচিতা বাঁচিয়ে চলতে হবে না’ (গোরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)। গোরা তাই সেদিন থেকে হিন্দু সমাজের আচার বিচারের গন্ডি পরিত্যাগ করে দীক্ষা নিতে চেয়েছেন এক নব জাতীয়তার- যেখানে থাকবে শুধু মানবতার ধর্ম। “আপনি আজ আমাকে সেই দেবতার মন্ত্রে দীক্ষা দিন যিনি হিন্দু, মুসলমান, খ্রীষ্টান, ব্রাহ্ম সকলেরই। যার মন্দিরের দ্বার কোন জাতীর কাছে, কোন ব্যক্তির কাছে কোন দিন অবরুদ্ধ হয় না, যিনি কেবলই হিন্দুর দেবতা নয়, গোটা ভারতবর্ষের দেবতা” (গোরা; রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)। কবির নিজের মনের মধ্যে ক্রমশ ধীরে ধীরে এমনি একটা সংস্কারমুক্তি ঘটেছিল, যার ফলে উদার বিশ্বমানবিকতার মধ্যেই বিশ্ব প্রকৃতি ও বিশ্বমানবের প্রতি যে এক অহেতুক প্রেম সে দিন কবির মনে জন্মলাভ করেছিল।

তাই অসাম্প্রদায়িক রবীন্দ্রনাথের কাছে শুনতে পেয়েছি “কোন সম্প্রদায় নয়, এই আশ্রম। তাই আমি বলছি যে, এ আশ্রম- এখানে কোনো দল নেই, সম্প্রদায় নেই। মানসসরোবরে যেমন পদ্ম বিকশিত হয় তেমনি এই প্রান্তরের আকাশে এই আশ্রমটি জেগে উঠেছে; একে কোনো সম্প্রদায়ের বলতে পারবে না। সত্যকে লাভ করবার দ্বারা আমরা তো কোনো নামকে পাই না। কতবার কত মহাপুরুষ এসেছেন- তাঁরা মানুষকে এইসব কৃত্রিম সংস্কারের বন্ধন থেকেই মুক্তি দিতে চেয়েছেন। কিন্তু, আমরা সে কথা ভুলে গিয়ে সেই বন্ধনেই জড়াই, সম্প্রদায়ের সৃষ্টি করি। যে সত্যের আঘাতে কারাগারের প্রাচীর ভাঙি তাই দিয়ে তাকে নতুন নাম দিয়ে পুনরায় প্রাচীর গড়ি এবং সেই নামের পুজো শুরু করে দিই। বলি, ‘আমার বিশেষ সম্প্রদায়-ভুক্ত সমাজ-ভুক্ত যে-সকল মানুষ তারাই আমার ধর্মবন্ধু, তারাই আমার আপন।’ না, এখানে এ আশ্রমে আমাদের এ কথা বলবার কথা নয়। এখানে এই পাখিরাই আমাদের ধর্মবন্ধু, যে সাঁওতাল বালকেরা আমাদের শুভবুদ্ধিকে নিয়ত জাগ্রত করছে তারাই আমাদের ধর্মবন্ধু। আমাদের এই আশ্রম থেকে কেউ নাম নিয়ে যাবে না। স্বাস্থ্যলাভ করলে, বিদ্যালাভ করলে, মানুষের নাম যেমন বদলায় না, তেমনি ধর্মকে লাভ করলে নাম বদলাবার দরকার নেই। এখানে আমরা যে ধর্মের দীক্ষা পাব সে দীক্ষা মানুষের সমস্ত মনুষ্যত্বের দীক্ষা ”(মুক্তির দীক্ষা)। এ বিষয়ে কবি আরো বলেছেন- “এখানে আমরা নামের পুজো থেকে, দলের পুজো থেকে আপনাদের রক্ষা করে সকলেই আশ্রয় পাবেন এইজন্যই তো আশ্রম।

যে কোন দেশ থেকে যে কোন সমাজ থেকে যেই আসুক না কেন,তাঁর পুণ্যজীবনের জ্যোতিতে পরিবৃত হয়ে আমরা সকলকেই এই মুক্তির ক্ষেত্রে আহবান করব। দেশ দেশান্তর দূর দূরান্তর থেকে যে কোন ধর্মবিশ্বাসকে অবলম্বন করে যিনিই এখানে আশ্রয় চাইবেন, আমরা যেন কাউকে গ্রহণ করতে কোন সংস্কারের বাধা বোধ না করি। কোন সম্প্রদায়ের লিপিবদ্ধ বিশ্বাসের দ্বারা আমাদের মন যেন সংকুচিত না হয়” (মুক্তির দীক্ষা)। ঈশ্বরের প্রেরিত বার্তাকে গুরুদেব মানব মুক্তির পথ হিসাবে গ্রহণ করে বলেছেন “যে মুক্তির বাণী তিনি তাঁর জীবন দিয়ে প্রচার করে গিয়েছিলেন তাকেই আমরা গ্রহণ করব; সেই তাঁর দীক্ষামন্ত্রটি; ঈশাবস্যমিদং সর্বং। ঈশ্বরের মধ্যে সমস্তকে দেখো। সেই মন্ত্রে তাঁর মন উতলা হয়েছিল। সর্বত্র সকল অবস্থায় আমরা যেন দেখতে পাই তিনি সত্য, জগতের বিচিত্র ব্যাপারের মধ্যে তিনি সত্যকেই প্রকাশ করছেন। কোনো সম্প্রদায় বলতে পারবে না যে, সে সত্যকে শেষ করে পেয়েছে। কালে কালে সত্যের নব নব প্রকাশ। এখানে দিনে দিনে আমাদের জীবন সেই সত্যের মধ্যে নূতন নূতন বিকাশ লাভ করবে, এই আমাদের আশা। আমরা এই মুক্তির সরোবরে ¯œান করে আনন্দিত হই, সমস্ত সম্প্রদায়ের বন্ধন থেকে নিস্কৃতি লাভ করে আনন্দিত হই (মুক্তির দীক্ষা ৭ পৌষ ১৩২০, প্রাতঃকাল)”। কবি ভাবতেন মানুষের মধ্যেই ঈশ্বরের প্রকাশ কখন, “যখন ইচ্ছার সঙ্গে ইচ্ছার, প্রেমের সঙ্গে আনন্দ মিলে যায় তখন ভক্তের মধ্যে ভগবানের এমন একটি আবির্ভাব হয় যা আর কোথাও হতে পারেনা” (আত্মবোধ)। কবি আসলে মনুষ্যত্বের ধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি নিজের জন্য কখনও ঈশ্বরের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেননি, কবি মানুষের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন “হে দেব, হে পিতা, তুমি বিশ্বপাপ মার্জনা করো মানুষ মরছে তাকে বাঁচাও। কে বাঁচাবে পিতা নোহসি। তুমি যে আমাদের সকলের পিতা, তুমি বাঁচাও। তোমার বোধের দ্বারা বাঁচাও। তোমাকে সকল মানুষ মিলে যে দিন নমস্কার করবো সেই দিন নমস্কার সত্য হবে। নইলে ভুলুন্ঠিত হয়ে মৃত্যুর মধ্যে যে নমস্কার করতে হয় সেই মৃত্যু থেকে বাঁচাও। দেশ দেশান্তরে তোমার যত যত সন্তান আছে, হে পিতা, তুমি প্রেম ভক্তিতে কল্যাণে সকলকে একত্র কর তোমার চরণ তলে। নমস্কার সর্বত্র ব্যাপ্ত হোক” (মা মা হিংসী)। সকল মানুষের জন্য রবীন্দ্রনাথ ক্ষমা প্রার্থনা করে বলেছেন,“তোমরা কেউবা পূর্বাচলের যাত্রী সূর্যোদয়ের দিকেই তোমাদের মুখ, সেই দিকে যিনি তোমাদের অভ্যুদয়ের পথে

আহবানন করছেন তাকে তোমরা পূর্বমুখ করেই প্রণাম করো। আমরা পশ্চিম অস্তাচলের দিকে জোড়হাত করে উপাসনা করি, সেই দিক থেকে আমাদের আহবান আসছে, সেই আহবান ও সুন্দর গুরুগম্ভীর এবং শান্তিময় আনন্দ রসে পরিপূর্ণ। অথচ পূর্ব পশ্চিমের মধ্যে ব্যবধান কোনখানেই নেই। আজ যেখানে বর্ষশেষ কাল সেখানে বর্ষারাম্ভ, একই পাতার এ পৃষ্ঠায় সমাপ্তি, ও পৃষ্ঠায় সমারম্ভ। কেউ কাউকে পরিত্যাগ করে থাকতে পারেনা। পূর্ব এবং পশ্চিম একটি অখন্ড মÐলের মধ্যে পরিপূর্ণ হয়ে রয়েছে। তাদের মধ্যে ভেদাভেদ নেই” (বর্ষশেষ)। সেদিন একজন ইংরেজ ভক্ত কবির কবিতায় দেখলুম তিনি ঈশ্বরকে ডেকে বলেছেন-

“Thou hast need of thy meanest creature
Thou hast need of what once was thine
The thirst that consumes my spirit
Is the thirst of the heart of mine, (আত্মবোধ)”

তিনি বলেছেন “তোমার দীনতম জীবনটিকেও তোমার প্রয়োজন আছে, সে যে একদিন তোমাতেই ছিল, আবার তুমি তাকে তোমারই করে নিতে চাও; আমার চিত্তকে যে তৃষ্ণা দগ্ধ করেছে সে যে তোমারই তৃষ্ণা, আমার জন্য তোমার হৃদয়ের তৃষা” (আত্মবোধ)। কবি বলরাম দাসের ভাষায়, “তোমার হিয়ার ভিতর হৈতে কে কৈল বাহির!” “তুমি আমার হৃদয়ের ভিতরেই ছিলে, কিন্তু বিচ্ছেদ হয়েছে, সেই বিচ্ছেদ মিটিয়ে আবার ফিরে এসো। সমস্ত দুঃখের পথ মাড়িয়ে আবার ফিরে এসো, হৃদয়ের সঙ্গে হৃদয়ের মিলন সম্পূর্ণ হোক” (রবীন্দ্র রচনাবলী ৮ম খন্ড পৃ ৬০৩)। ‘এই একটি বিরহ বেদনা অন্তরের মধ্যে রয়েছে, সেই জন্য আমার মধ্যেও-

I have come from thee, why I know not;
But thou art. O God! What thou art;
And the round of eternal being is the pub
Of the beating heart.’ (আত্মবোধ)

“আমি তোমার মধ্যে থেকে এসেছি কেন সে তা জানিনে, কিন্তু হে ঈশ্বর, তুমি যেমন তেমনি আছ; এই যে একবার তোমার থেকে বেরিয়ে আবার যুগযুগান্তরের মধ্যে দিয়ে তোমাতেই ফিরে আসা, এই হচ্ছে তোমার অসীম হৃদয়ের এক একটি হৃদস্পন্দন। অন্তরের মধ্যে এই যে বিরহ বেদনা সমস্ত বিশ্বকাব্য রচনা করে তুলেছে” (আত্মবোধ)। কবি জ্ঞানদাস তাঁর ভগবানকে বলেছেন; এই যে, ‘বিরহ বেদনা তোমাতে আমাতে ভাগ করে ভোগ করব; এ বেদনা যেমন তোমার তেমনি আমার। তাই কবি বলেছেন ; আমি যে দুঃখ পাচ্ছি তাতে তুমি লজ্জা করো না প্রভু! ভোগের সুখতো আমি চাইনে-যারা দাসী তাঁদের সুখের বেতন দিও”(রবীন্দ্র রচনাবলী ৮ম খন্ড পৃ ৬০৪)! ‘আমি যে তোমার পত্নী, আমি তোমার সমস্ত দুঃখের ভার তোমার সঙ্গে বহন করব, সেই দুঃখের ভিতর দিয়েই সেই দুঃখকে উত্তীর্ণ হব। আমার মধ্যে তোমার প্রকাশ অখন্ড মিলনে সম্পূর্ণ হবে। সেই জন্য আমি বলছিনা আমাকে দুঃখ দাও, আমি বলছি- হে প্রকাশ তুমি আমার মধ্যে তুমি প্রকাশিত হও’ (আত্মবোধ)। ঈশ্বরের কাছে সকল মানুষের জন্য কবির শেষ প্রার্থনা ছিল “পিতা নোহসি পিতা নো বোধি। তুমি আমাদের পিতা, তুমি পিতা আমাদের এই বোধ দাও। এই পিতার বোধ আমাদের অন্তঃকরণে সজাগ নেই বলে আমাদের যেমনই ক্ষতি হোক, পিতার সঙ্গে আমাদের সম্বন্ধের দিক দিয়ে তাঁর কাজ সমানই চলেছে। আমাদের বোধের অসম্পুর্ণ তাতে তাঁর কোনো ব্যাঘাত হয়নি। তিনি তাঁর সমস্ত সন্তানের মধ্যে চৈতন্য ও প্রাণ প্রেরণ করেছেন, তাঁর পিতৃত্ব মানবসমাজে কাজ করেই চলেছে” (মাধুর্যের পরিচয়)।

রবীন্দ্রনাথ তাঁর জীবন জগৎ ও সাহিত্য সাধনার বাইরে এসে সুদুর পল্লী গ্রাম পতিসরে এসে আবিস্কার করেন মানুষের মধ্যেই মানবতার ধর্ম বিরাজিত। পতিসরে এসে দুজন বাউল সাধককে রবীন্দ্রনাথ জিজ্ঞাসা করেছিলেন “কি তোমাদের ধর্ম?” তা থেকে রবীন্দ্রনাথ যা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন, তা গেঁথে নিয়েছিলেন তাঁর সাহিত্যও সাধনায়। সেই বোধ থেকেই রবীন্দ্রনাথ তাঁর “আত্মবোধ” প্রবন্ধে লিখেছেন।

কয়েকদিন হল পল্লীগ্রামে কোনো বিশেষ সম্প্রদায়ের দুইজন বাউলের সঙ্গে আমার দেখা হয়। আমি তাদের জিজ্ঞাসা করলুম,‘তোমাদের ধর্মের বিশেষত্বটি কি আমাকে বলতে পার? একজন বললে,‘বলা বড়ো কঠিন, ঠিক বলা যায় না।’ আর একজন বললে,‘বলা যায় বৈকিÑকথাটা সহজ। আমরা বলি এই যে, গুরুর উপদেশে গোড়ায় আপনাকে জানতে হয়। যখন আপনাকে জানি তখন সেই আপনার মধ্যে তাঁকে পাওয়া যায়। আমি জিজ্ঞাসা করলুম,‘তোমাদের এই ধর্মের কথা পৃথিবীর লোককে সবাইকে শোনাও না কেন।’ সে বললে,‘যার পিপাসা হবে সে গঙ্গার কাছে আপনি আসবে।’ আমি জিজ্ঞাসা করলুম,‘তাই কি দেখতে পাচ্ছ। কেউ কি আসছে।’ সে লোকটি অত্যন্ত প্রশান্ত হাসি হেসে বললে,‘সবাই আসবে। সবাইকে আসতে হবে।’

কবি পল্লীগ্রামের নিরেট বাউলের মাঝে খুঁজে পেয়েছিলেন অনন্ত সত্যকে, যে সত্য কেবল শ্রষ্ঠার অনাগত রূপ। সব মানুষের একক স্থান, একক আবাস, যেখানে সবাইকে যেতে হবে, সবাইকে আসতে হবে সেই একক ঠিকানায়। কবির ভাবনায়- “আমি এই কথা ভাবলুম, বাংলাদেশের পল্লীগ্রামের শাস্ত্রশিক্ষাহীন এই বাউল, এ তো মিথ্যা বলেনি। আসছে, সমস্ত মানুষই আসছে। কেউ তো স্থির হয়ে নেই। আপনার পরিপূর্ণতার অভিমুখেই তো সবাইকে চলতে হচ্ছে, আর যাবে কোথায়। আমরা প্রসন্ন মনে হাসতে পারিব পৃথিবী জুড়ে সবাই যাত্রা করেছে। আমরা কি মনে করছি সবাই কেবল নিজের উদর-পূরণের অন্ন খুঁজতে, নিজের প্রাত্যহিক প্রয়োজনের চারিদিকেই প্রতিদিন প্রদক্ষিণ করে জীবন কাটিয়ে দিচ্ছে? না, তা নয়। এই মুহূর্তেই পৃথিবীর সমস্ত মানুষ অন্নের জন্যে, বস্ত্রের জন্যে, নিজের ছোটো বড়ো কত শত দৈনিক আবশ্যকের জন্যে ছুটে বেড়াচ্ছেন কিন্তু, কেবল তার সেই আহ্নিক গতিতে নিজেকে প্রদক্ষিণ করা নয়, সেই জেনে এবং না জেনে একটি প্রকান্ড কক্ষে মহাকাশে আর একটি কেন্দ্রের চার দিকে যাত্রা করে চলেছেন যে কেন্দ্রে সঙ্গে সে জ্যোতির্ময় নাড়ির আকর্ষণে বিধৃত হয়ে রয়েছে, যেখান থেকে সে আলোক পাচ্ছে, প্রাণ পাচ্ছে, যার সঙ্গে একটি অদৃশ্য অথচ অবিচ্ছেদ্য সূত্রে তার চিরদিনের মহাযোগ রয়েছে।” রবীন্দ্রনাথ পরিতসরের দু’জন বাউলের মাঝে খুজে নিয়ে ছিলেন একটা আধ্যাতিœক সত্য কে। এ প্রসঙ্গে কবি আরও লিখেছেন-“মানুষ অন্নবস্ত্রের চেয়ে গভীর প্রয়োজনের জন্যে পথে বেরিয়ে পড়েছে। কি সেই প্রয়োজন? তপোবনে ভারতবর্ষের ঋষি তার উত্তর দিয়েছেন এবং বাংলাদেশের পল্লীগ্রামে বাউলও তার উত্তর দিচ্ছে। মানুষ আপনাকে পাবার জন্যে বেরিয়েছে; আপনাকে না পেলে, তার আপনার চেয়ে যিনি বড়ো আপন তাঁকে পাবার জো নেই। তাই এই আপনাকেই বিশুদ্ধ ক’রে, প্রবল ক’রে, পরিপূর্ণ ক’রে পাবার জন্যে মানুষ কত তপস্যা করছে। শিশুকাল থেকেই সে আপনার প্রবৃত্তিকে শিক্ষিত ও সংযত করছে, একÑএকটি বড়ো বড়ো লক্ষ্যের চার দিকে সে আপনার ছোটো ছোটো সমস্ত বাসনাকে নিয়মিত করবার চেষ্টা করছে, এমন-সকল আচারÑঅনুষ্ঠানের সে সৃষ্টি করছে যার অবসান নেই। সে এমন একটি বৃহৎ আপনাকে চাচ্ছে যে-আপনি তার বর্তমানকে, তার চার দিককে, তার প্রবৃত্তি ও বাসনাকে ছাড়িয়ে অনেক দূরে চলে গেছে।”(আত্মবোধ)

নাগর নদীর ধারে পল্লি কুটিরে বসে সাধক রবীন্দ্রনাথ সত্যকে উপলদ্ধি করে আরও লিখেছেন-“আমাদের বৈরাগী বাংলাদেশের একটি ছোটো নদীর ধারে এক সামান্য কুটিরে বসে এই আপনির খোঁজ করছে এবং নিশ্চিন্ত হাস্যে বলছে, সবাইকেই আসতে হবে এই আপনির খোঁজ করতে। কেননা, এ তো কোনো বিশেষ মতের বিশেষ সম্প্রদায়ের ডাক নয়; সমস্ত মানবের মধ্যে যে চিরন্তন সত্য আছে এ যে তারই ডাক। কলরবের তো অন্ত নেইÑকত কলÑকারখানা, কত যুদ্ধবিগ্রহ, কত বাণিজ্য-ব্যবসায়ের কোলাহল আকাশকে মথিত করছে; কিন্তু মানুষের ভিতর থেকে সেই সত্যের ডাককে কিছুতেই আচ্ছন্ন করতে পারছে না। মানুষের সমস্ত ক্ষুধাতৃষ্ণা সমস্ত অর্জন-বর্জনের মাঝখানে সে রয়েছে। কত ভাষায় সে কথা কইছে, কত কালে কত দেশে কত রূপে কত ভাবে সমস্ত আশুপ্রয়োজনের উপর সে জাগ্রত হয়ে আছে। কত তর্ক তাকে আঘাত করছে, কত সংশষ তাকে অস্বীকার করছে, কত বিকৃতি তাকে আক্রমণ করছে, কিন্তু সে বেঁচেই আছে। সে কেবলই বলছে তোমার আপনিকে পাত্ত; আত্মানং বিদ্ধি। এই আপনিকে মানুষ সহজে আপন করে তুলতে পারছে না, সেইজন্যে মানুষ সূত্রচ্ছিন্ন মালার মতো কেবলই খসে যাচ্ছে, ধুলোয় ছড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু, যে বিশ্বজগতে সে নিশ্চিন্ত হয়ে বাস করছে সেই জগৎ তো মুহুর্র্তে এমন করে খসে পড়ছে না, ছড়িয়ে পড়ছে না। অথচ এই জগৎটি তো সহজ জিনিস নয়। এর মধ্যে যে-সকল বিরাট শক্তি কাজ করছে তাদের নিতান্ত নিরীহ বলা যায় না। আমাদের এতটুকু রাসায়নিক পরীক্ষাশালায় যখন সামান্য একটা টেবিলের উপর দু-চার কণা গ্যাসকে অল্প একটু বন্ধনমুক্ত করে দিয়ে তাদের লীলা দেখতে যাই তখন শঙ্কিত হয়ে থাকতে হয় তাদের গলাগলি জড়াজড়ি ঠেলাঠেলি মারামারি যে কি অদ্ভুত এবং কি প্রচন্ড তা দেখে বিস্মিত হই। বিশ্ব জুড়ে আবিস্কৃত এবং অনাবিস্কৃত এমন কত শত বাস্পপদার্থ তাদের কত বিচিত্র প্রকৃতি নিয়ে কি কান্ড বাধিয়ে বেড়াছে তা আমরা কল্পনা করতেও পারি নে। তার উপরে জগতের মূল শক্তিগুলিও পরস্পরের বিরুদ্ধ। আকর্ষণের উল্লাস শক্তি বিকর্ষণ, কেন্দ্রানুগের উলটো শক্তি কেন্দ্রাতিগ। এই-সমস্ত বিরুদ্ধতা ও বৈচিত্র্যের প্রকান্ড লীলাভূমি এই যে জগৎ এখানকার আলোতে আমরা অনায়াসে চোখ মেলেছি, এখানকার বাতাসে অনায়াসে নিঃশ্বাস নিচ্ছি, এর ফলে স্থলে অনায়াসে সঞ্চরণ করছি। যেমন আমাদের শরীরের ভিতরটাতে কত রকমের কত কি কাজ চলছে যার ঠিকানা নেই, কিন্তু আমরা সমস্তটাকে জড়িয়ে একটি অখন্ড স্বাস্থ্যের মধ্যে এক করে জানছি- দেহটাকে হৃৎপিন্ড মস্তিষ্ক পাকযন্ত্র প্রভৃতির জোড়াতাড়া ব্যাপারে বলে জানছি নে। জগতের রহস্যাগারের মধ্যে শক্তির ঘাত প্রতিঘাত যেমনি জটিল ও ভয়ংকর হোক না কেন, আমাদের কাছে তা নিতান্তই সহজ হয়ে দেখা দিয়েছে অথচ জগৎটা আসলে যে কি তা যখন সন্ধান করে বুঝে দেখবার চেষ্টা করি তখন কোথাও আর তল পাওয়া যায় না। সকলেই জানেন বস্তুতত্ত¡ সম্বন্ধে এক সময় বিজ্ঞান ঠিক করে রেখেছিল। যে পরমাণুর পিছনে আর যাবার জো নেইÑসেই সকল ক্ষুদ্রতম মূল-বস্তুর যোগবিয়োগেই জগৎ তৈরি হচ্ছে। কিন্তু বিজ্ঞানের সেই মূল-বস্তুর দুর্গও আজ আর টেকে না। আদিকারণের মহাসমুদ্রের দিকে বিজ্ঞান যতই এক-এক পা এগুচ্ছে ততই বস্তুত্বের কুলকিনরা কোন দিগন্তবলে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে সমস্ত বৈচিত্র্য সমস্ত আকার-আয়তন একটা বিরাট শক্তির মধ্যে একেবারে সীমা হারিয়ে আমাদের ধারণার সম্পূর্ণ অতীত হয়ে উঠছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এই যে, যা এক দিকে আমাদের ধারণার একেবারেই অতীত তাই আর এক দিকে নিতান্ত সহজেই আমাদের ধারণাগম্য হয়ে আমাদের কাছে ধরা দিয়েছে। সেই হচ্ছে আমাদের এই জগৎ। এই জগতে শক্তিকে শক্তিরূপে বিজ্ঞানের সাহায্যে আমাদের জানতে হচ্ছে না; আমরা তাকে অত্যন্ত প্রত্যক্ষ দেখতে পাচ্ছিÑজলস্থল, তরুলতা, পশুপক্ষী। জল মানে বাষ্পবিশেষের যোগবিয়োগ বা শক্তিবিশেষের ক্রিয়ামাত্র নয়Ñজল মানে আমারই একটি আপন সামগ্রী, সে আমার চোখের জিনিস, স্পর্শের জিনিস; সে আমার ¯œানের জিনিস, পানের জিনিস; সে বিবিধ প্রকারেই আমার আপন। বিশ্বজগৎ বলতেও তাই স্বরূপত তার একটি বালুকণাও যে কি তা আমরা ধারণা করতে পারি নে, কিন্তু সম্বন্ধ সে বিচিত্রভাবে বিশেষভাবে আমার আপন।”(আত্মবোধ) কবি যাকে ধরতে চেয়েছিল ধরতে পারিনি, ধরা দিয়ে ছিল আপন মনে- “যাকে ধরা যায় না সে আপনিই আমার আপন হয়ে ধরা দিয়েছে। এতই আপন হয়ে ধরা দিয়েছি যে দুর্বল উলঙ্গ শিশু এই অচিন্ত্য শক্তিকে নিশ্চিন্ত মনে আপনার ধুলোখেলার ঘরের মতো ব্যবহার করছে, কোথাও কিছু বাধছে না। তাই বলছিলুম, ঘুরে ফিরে মানুষ যা-কিছু করছে-কখনো বা ভুল বারে কখনো বা ভুল ভেঙ্গে-সমস্তর মূলে আছে এই আত্মবোধের সাধনা। সে যাঁকেই চাক-না সত্য করে যাচ্ছে এই আপনাকে, জেনে যাচ্ছে, না জেনে যাচ্ছে। বিশ্বব্রহ্মান্ডের সমস্তকে বিরাটভাবে একটি জায়গায় মিলিয়ে জড়িয়ে নিয়ে মানুষ আত্মার একটি অখন্ড উপলব্ধিকে পেতে যাচ্ছে। সে একরকম করে বুঝতে পারছে কোনোখানেই বিরোধ সত্য নয়, বিচ্ছিন্নতা সত্য নয়, নিরন্তর অবিরোধের মধ্যে মিলে উঠে একটি বিশ্বসংগীতকে প্রকাশ করবার জন্যই বিরোধের সার্থকতা-সেই সংগীতেই পরিপূর্ণ আনন্দ। নিজের ইতিহাসে মানুষ সেই তানটাকেই কেবল সাধছে, সুরের যতই স্খলন হোক তবু কিছুতেই নিরস্ত হচ্ছে না। উপনিষদের বানীর দ্বারা সে কেবলই বলছেঃ তঃমেবৈকং জনেথ আত্মানম্। সেই এককে জানো, সেই আত্মাকে। অমৃতস্যৈষ সেতুঃ। ইহাই অমৃতের সেতু। আপনার মধ্যে এই এককে পেয়ে মানুষ যখন ধীর হয়, যখন তরে প্রবৃত্তি শান্ত হয়, সংযত হয়, তখন তার বুঝতে বাকি থাকে না এই তার এক কাকে খুঁজছে। তার প্রবৃত্তি খুঁজে মরে নানা বিষয়কে কেননা, নানা বিষয়কে নিয়েই সে বাঁচে, নানা বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত হওয়াই তার সার্থকতা। কিন্তু যেটি হচ্ছে মানুষের এক, মানুষের আপনি, সে স্বভাবতই একটি আসীম এককে, একটি অসীম আপনিকে খুঁজছে-আপনার ঐক্যের মধ্যে অসীম ঐক্যকে অনুভব করলে তবেই তার সুখের স্পৃহা শান্তি লাভ করে। তাই উপনিষৎ বলেন- ‘একং রূপং বহুধা করোতি’ যিনি একরূপকে বিশ্বজগতে বহুধা করে প্রকাশ করেছেন; তম আত্মস্থং যে অনুপশ্যন্তি ধীরাঃ তাঁকে ধীরেরা আত্মস্থ করে দেখেন,‘তেষাং সুখং শাশ্বত নেত রেষাম্’ তাঁদেরই সুখ নিত্য, আর কারও না। আত্মার সঙ্গে এই পরমাত্মাকে দেখা এ অত্যন্ত একটি সহজ দৃষ্টি, এ একেবারেই যুক্তিতর্কের দৃষ্টি নয়। এ ইচ্ছে ‘দিবীব চক্ষুরাততং’। চক্ষু যেমন একেবারে সহজেই আকাশে বিস্তীর্ণ পদার্থকে দেখতে পায় এ সেইরকম দেখা। আমাদের চক্ষুর স্বভাবই হচ্ছে সে কোনো জিনিসকে ভেঙ্গে ভেঙ্গে দেখে না, একেবারে সমগ্র করে দেখে সে স্পেকট্রস্কোপ যন্ত্র দিয়ে দেখার মতো করে দেখে না, সে আপনার মধ্যে সমস্তকে বেঁধে নিয়ে আপন করে দেখতে জানে। আমাদের আত্মবোধের দৃষ্টি যখন খুলে যায় তখন সেও তেমনি অত্যন্ত সহজেই আপনাকে এক করে এবং পরম একের সঙ্গে আনন্দে সম্মিলিত করে দেখতে পায়। সেইরকম করে সমগ্র করে দেখাই তার সহজ ধর্ম। তিনি যে পরম-আত্মা, আমাদের পরম-আপনি। সেই পরম-আপনিকে যদি আপন করেই না জানা যায়, তা হলে আর যেমন করেই জানা যাক তাঁকে জানাই হল না। জ্ঞানে জানাকে আপন করে জানা বলে না, ঠিক উলটো জ্ঞান সহজেই তফাত করে জানে, আপন করে জানবার শক্তি তার হাতে নেই।”(আত্মবোধ) কবি আত্মার মাঝে খুঁজে নিয়েছিলেন পরমাত্মাকে, মানুষের মাঝে- সত্যকে, সৃষ্টির মাঝে-শ্রষ্ঠাকে, ভক্তের মাঝে-ভগবানকে, সীমার মাঝে-অসিমকে। অধরাকে-ধরেছেন, সত্যকে উপলদ্ধি করেছেন প্রত্যক্ষভাবে। তাই কবি সহজভাবে লিখেছেন, যখন ইচ্ছার সঙ্গে ইচ্ছা, সত্যের সঙ্গে সত্য, আনন্দের সঙ্গে আনন্দ মিলে যায়- তখনি কেবল ভক্তের মাঝে ভগবানের-যথার্থ আর্বিভাব ঘটে, যা অন্য কথাও হতে পারেনা। তাই কবি মানবের মাঝে প্রকৃত সত্য উপলদ্ধি করেছেন, বিচিত্রের মাঝে একককে পূঁজা করেছেন। কেননা, কবি অনুভব করেছেন যুদ্ধের মাঝেই শান্তনার বাণী, বিচ্ছেদের মাঝেই মিলনের সুর, মন্দের মাঝেই মহাকল্যাণের বাণী এবং সকল সত্য বাণীই একক মানুষের।

ড. মোঃ আব্দুল খালেক খান (মুক্তিযোদ্ধা)
Managing Director & CEO
Bangladesh Commerce Bank Ltd.




More News Of This Category




side bottom




© All rights reserved © 2020 Atozithost
Design & Developed by: ATOZ IT HOST
Tuhin